প্রথম পাতা

ইসি থেকে ঐক্যফ্রন্টের ওয়াকআউট

ইসি থেকে ঐক্যফ্রন্টের ওয়াকআউ  

পুলিশ লাঠিয়াল বাহিনী: ড. কামাল, আপনি কী হয়ে গেছেন পুলিশকে লাঠিয়াল-জানোয়ার বলছেন :

নির্বাচন কমিশনে (ইসি) ভোটের পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ জানাতে গিয়ে আলোচনার দেড় ঘণ্টা পর বৈঠক থেকে বেরিয়ে যান জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। গতকাল নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা ও অন্য নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে বৈঠক করেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। আলোচনায় নেতৃত্ব দেন ফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন। বৈঠকে তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপি নেতা ড. মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা আব্বাস, গণফোরাম নেতা মোস্তফা মহসীন মন্টু, সুব্রত চৌধুরী ও ঐক্যফ্রন্ট নেতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী । বৈঠক সূত্র জানায়, সভাকক্ষে সিইসি ও ড. কামাল হোসেনের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। দেড় মাস আগেও ইসি-ঐক্যফ্রন্টের বৈঠকে দুই পক্ষের বক্তব্যে উত্তাপ ছড়ায়। গতকাল বৈঠকের এক পর্যায়ে সিইসি কে এম নূরুল হুদা ড. কামাল হোসেনকে বলেন, ‘আপনি নিজেকে কী মনে করেন?’ তাঁর বক্তব্য নিয়ে বৈঠকে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। পরে কামাল হোসেনের বক্তব্যকে সিইসি ‘অবজ্ঞা’ করেছেন বলে মন্তব্য করে বৈঠক বর্জন (ওয়াকআউট) করে ঐক্যফ্রন্ট।

কী হয়েছিল বৈঠকে? বৈঠক সূত্র জানায়, সিইসির কাছে ঐক্যফ্রন্টের নেতারা বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন। এ সময় ড. কামাল হোসেন পুলিশের গ্রেফতার, হয়রানির বিষয়ে কমিশনকে অবহিত করেন। জবাবে সিইসি ড. কামালের কাছে জানতে চানÑ ‘কোথায় নির্যাতন হচ্ছে দেখান। চলেন আমাকে নিয়ে যান সেখানে।’ এর জবাবে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘আমাদের লোকজন আইসিইউতে, মারধর করা হচ্ছে নেতা-কর্মীদের।’ সিইসি বলেন, ‘পুলিশ এত খারাপ নয়। আপনাদের কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’ এ সময় ড. কামাল হোসেন সিইসিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘সিইসি বর্তমানে বিচারপতির চেয়েও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারেন। আপনি ইচ্ছা করলে “জানোয়ার-লাঠিয়াল পুলিশবাহিনী”কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। আপনার এই “লাঠিয়াল” পুলিশবাহিনী আমাদের মিটিং-মিছিল কিছুই করতে দিচ্ছে না।’ এ সময় সিইসি ড. কামাল হোসেনকে বলেন, ‘আপনি নিজেকে কী মনে করেন? আপনি এমন কী হয়েছেন যে আমার পুলিশকে লাঠিয়াল, জানোয়ার বলছেন!’ এ সময় অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার ও রফিকুল ইসলাম চুপ ছিলেন। একপর্যায়ে বিএনপি নেতা মঈন খান সিইসিকে উদ্দেশ করে বলেন, নির্বাচনের কোনো পরিবেশ যদি সৃষ্টি করতে না পারেন, তাহলে বলে দেন, আমরা আজকেই প্রেস ক্লাবে গিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ভোট বর্জনের বিষয়ে ঘোষণা দিই। দুই পক্ষের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের একপর্যায়ে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা বৈঠক থেকে বেরিয়ে যান। এরপর নির্বাচন কমিশনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে সিইসি কথাগুলো কোনো গুরুত্ব দেননি। কোনো আশ্বাসও পাইনি।’ তাই আলোচনার একপর্যায়ে তারা বৈঠক থেকে বেরিয়ে আসেন বলে জানান বিএনপি মহাসচিব। ভোটের তিন দিন আগেও নির্বাচন কমিশন ও সরকার ন্যূনতম পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি বলে অভিযোগ করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ‘ভোটের মাঠে ভয়াবহ তা ব চলছে। নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার, আটক, নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। সরকার ও ইসি যৌথভাবে এ নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। ইসি ও সরকার যৌথভাবে এ নির্বাচন প্রহসনে পরিণত করেছে। তবে ফাঁকা মাঠে গোল দিতে দেব না।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন, ‘আমাদের অনেক প্রার্থী জেলে, তাদের পরিবারের সদস্যরা প্রচার করতে গিয়ে হামলায় আহত হয়ে আইসিইউতে আছেন। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে গ্রেফতার ও মারধর করা হচ্ছে, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয়ে আলোচনার পর আমরা আশা করছিলাম যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যারা আইসিইউতে আছেন, যাদের বাড়িঘর পুড়ে গেছে তাদের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে সিইসি বক্তব্য দেবেন। কিন্তু উনি এর ধারেকাছে না গিয়ে, যাদের বিরুদ্ধে আমরা অভিযোগ করেছি, তাদের পক্ষাবলম্বন করলেন।’ ড. মঈন খান অভিযোগ করেন, ‘১১ তারিখ আমার শান্তিপূর্ণ গণসংযোগে আক্রমণ হয়েছে। ১৬ তারিখ আক্রমণ হয়েছে। এরপর সোমবার আবার আক্রমণ হয়েছে। আমি সিইসিকে বলেছি, আমার ৭২ বছর বয়স। নিজের জীবন গেলেও সমস্যা নেই। যারা মানবঢাল করে আমার জীবন রক্ষা করেছেন, এই কয়েক দিনে তিনবার তারা আমাকে রক্ষা করেছেন, আমি কি তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেব? আপনি আমাকে স্পষ্ট বলে দিন, যদি আমাকে বলেন নির্বাচন করতে দেবেন, তাহলে আমি করব। আর যদি না দেন, তাহলে বিকালে প্রেস ক্লাবে গিয়ে জানাব আমার পক্ষে নির্বাচন করা সম্ভব নয়।’ ড. কামাল হোসেনের বক্তব্যকে ‘অবজ্ঞা’র প্রতিবাদে বৈঠক বর্জন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী। বৈঠক সম্পর্কে জাফরুল্লাহ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, সিইসি এভাবে কথা বলেছেন যেন ড. কামাল হোসেন মিথ্যা বলছেন। সিইসির অবজ্ঞাজনিত ব্যবহারের প্রতিবাদ জানিয়েছেন ড. কামাল হোসেন। এ সময় একটু উচ্চৈঃস্বরে দুজনই কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা দুঃখের কাহিনী শোনাচ্ছি সিইসিকে। কিন্তু সিইসি পুলিশকে ডিফেন্ড করেন। যেন মিথ্যা কথা বলতে গেছি আমরা।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের কথা বিশ্বাস করছেন না সিইসি। একটা অপমানজনক কথা বলেন তিনি। ড. কামাল হোসেন সিইসিকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি জজ। আপনি বিচারক হিসেবে এভাবে বলতে পারেন না। আপনি অভিযুক্তের পক্ষ নিচ্ছেন।’ জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘সিইসির বক্তব্য ছিল অবজ্ঞাজনিত, অভদ্রজনিত।’

অবিলম্বে সিইসির পদত্যাগ চেয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট : অবিলম্বে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদার পদত্যাগ চেয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। রাষ্ট্রপতির কাছে অবিলম্বে একজন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ঐক্যফ্রন্ট নেতারা। সিইসি কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত রাতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটি ও বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্যদের যৌথ বৈঠকের পর তিনি সাংবাদিকদের এ কথা জানান। রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতেও এ দাবি জানানো হয়। এর আগে গতকাল দুপুরে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ ১০ নেতার সঙ্গে ইসির বৈঠক হয়। বৈঠকে সিইসির বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ এনে বৈঠক থেকে বের হয়ে যান ঐক্যফ্রন্ট নেতারা। পরে সন্ধ্যার পর জরুরি বৈঠক শেষে মির্জা ফখরুল সিইসির পদত্যাগ দাবি করেন। বৈঠক শেষে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এটা কোনো নির্বাচন হচ্ছে না, রক্তের হোলি খেলা হচ্ছে। সব জায়গায় আমাদের প্রার্থীদের ওপর হামলা করা হচ্ছে। মহিলারাও বাদ যাচ্ছেন না।’ এ সময় তিনি বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আহত গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে দেখিয়ে বলেন, ‘এটি হলো ২০১৮ সালের নির্বাচন। রক্তাক্ত সাবেক মন্ত্রী গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। আজ গণফোরামের সুব্রত চৌধুরীও আক্রান্ত হয়েছেন। কাউকে বাদ দিচ্ছে না। দেখে মনে হচ্ছে, এটা কোনো নির্বাচন নয়।’ মির্জা ফখরুল বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ, অকার্যকরÑ এটা আজ জাতির সামনে প্রমাণিত হয়েছে। আমরা এ মুহূর্তে সিইসির পদত্যাগ চাই। এখনই চাই। তিনি পদত্যাগ করুন।’এরপর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে দেওয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিবৃতি পাঠ করে শোনান বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘সারা দেশে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের ওপর হামলা, মামলা, নির্যাতনের বিষয়ে অবহিত করতে আজ (গতকাল) দুপুর ১২টায় আমরা নির্বাচন কমিশনে গিয়েছিলাম ড. কামাল হোসেন ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে। কিন্তু আমাদের অভিযোগ শুনে সিইসি নূরুল হুদা সরকারদলীয় রাজনৈতিক নেতার মতো আচরণ করেছেন। ড. কামাল হোসেনসহ ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের সঙ্গে সিইসি যে আচরণ করেছেন, তা ছিল অত্যন্ত অশোভন ও অশালীন। এর ফলে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা তৎক্ষণাৎ ক্ষোভ জানিয়ে বৈঠক বর্জন করেন।’ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান এমন অযৌক্তিক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য দিতে পারেন, তা অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে। এ ঘটনায় স্পষ্টতই প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাকে নিয়োগ দানকারী ক্ষমতাসীন সরকারের অতি বাধ্যগত একজন কর্মচারীর চেয়ে আর বেশি কিছু নন। তার কাছ থেকে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ নির্বাচন তো দূরের কথা, নিরপেক্ষ আচরণ পাওয়ারও কোনো সম্ভাবনা নেই। এ অবস্থায় আমরা অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে অবিলম্বে একজন মেরুদ হীন, পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তির নেতৃত্ব থেকে নির্বাচন কমিশনকে মুক্ত করা অনিবার্য প্রয়োজন বলে মনে করি। আমরা অবিলম্বে তার পদত্যাগ দাবি করছি এবং যথার্থই একজন নির্দলীয় নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে অনতিবিলম্বে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ করার জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে দাবি জানাচ্ছি।’ সব শেষে দেশের সর্বত্র জনগণের ঐক্য গড়ে তুলে জনগণের ভোটের অধিকার আদায়ের জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান নজরুল ইসলাম খান। নির্বাচনী প্রচারণার সময় হামলার শিকার বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, নির্বাচন কমিশনের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে ইসি ১৯৭১ সালের আলবদর, আলশামস বাহিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে ক্ষমতাসীনদের বিজয়ী করতে। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে জনগণ যেভাবে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করেছে, ঠিক একইভাবে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের পরাজিত করবে। আমরা বলতে চাই, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। তবু মানুষের ভোটের অধিকার আদায় করে ছাড়ব।’

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close